Categorisation Narrows the Glory of Creation. A composition of prose miscellany. প্রকাশক : প্রতীতি। প্রকাশকাল ফেব্রুয়ারি ২০০৩।

Thursday, January 31, 2008

ভালো-লাগা মন্দ-লাগার অনুভূতিটা চক্রক্রমিক

অচেনাকে উন্মোচনের আকৈশোর বাসনা তার, অরণ্যের, খতিয়ে দেখতে চায় ভেতরে কী আছে আড়ালে-আবডালে, কোন্ অন্ধকারে লুকানো কোন্ সুর, ছবির মহিমা, কাব্যবীজ, অচেনার উরু-জঙ্ঘা-স্তন কেমন ধাতুয় নির্মিত, কতটা সুসহ-- তার এ আচ্ছন্নতার কথা অনেকেই জানে, অথচ এ চেনা জগৎ-প্রতিবেশ থেকে সটকে পড়বার চমৎকার এক সুযোগকে হাতের কাছে পেয়েও তার এরকমভাবে নেতিয়ে যাবার কারণ আবিষ্কার করতে না পেরে, রাহা নিজেই একটু রহস্যময় ও অচেনার ব্যঞ্জনা ধারণ করে সামনে এসে দাঁড়ায়, সে ভাবে অন্যকথা, নিজের বাগানে চেয়ে, এই যে আমি, রাহা, আলোর খাপে যে আটকাই না, সতত প্রবহমাণ ও ঔজ্জ্বল্যসঞ্চারী, তার মোহে জগতের সমস্ত প্রজাপতি একদিন ওড়া ভুলে কাঁধের ভূগোলে এসে যদি বসে যায়, তো বিস্ময় মানবে কে

রাহা ওকে জানে, অরণ্যকে, কালো-কালো বনতিলক ওর শরীরের সৌরভ বাড়াতে যেমন মগ্নতাচারী, সে ওর মনোরঞ্জনে নিজেকে খুলে রাখে তেমনি নিষ্ঠ-নিবিড়তায়, জানে বিকশিত সবুজকে সংরক্ষণ করতে হয় বলেই নয়, বরং তারও অধিক পরিযায়ী পাখিদের জননবেদনা বিষয়ক কিছু চিন্তাজালে অরণ্যকে জড়িয়ে থাকতে হয় রাতদিন, ষড়ঋতু ব্যাপে, তার কোনো অবসর নেই, একটা মুহূর্তে হয় বনঘুঘু ডাকছে না ঠিক কিন্তু পাতা ঝরছে অথবা অন্যকিছু, বাতাস বইছে, রোদ উঠছে, অতএব একটা-না-একটা ব্যস্ততা তাকে জড়িয়ে থাকেই, এর মধ্যেও তার বেরিয়ে পড়বার শখ পরিচিত পরিসর ছেড়ে, সে কেবল এজন্যে যে অচেনাকে চেনা হবে, তার ডাকনাম, প্রিয়-অপ্রিয় জানা যাবে, রূপ-বৈভব দেখা হবে, কিন্তু এত যার আকাঙ্ক্ষা, ক্ষুধানিবৃত্তির সমস্ত উপায়-উপকরণ কোনোভাবে যদি ধর্তব্যের মধ্যে এসেই যায় তার, তবে কেনই-বা একজনের বিপরীতাগ্রহ হবে, এতবড়ো রহস্যের সম্মুখে রাহার আর পড়তে হয় নি জীবৎকালে, সে জেনেছে একটা শিশু যদি খেলতে চায় তাকে কোলের বন্ধন থেকে মুক্তি দিলেই সে খুশি হয়, বন্দি পাখির যখন উড়বার সাধ হয়, তখন খাঁচার দ্বার খুলে দিলেই সেটা প্রসন্ন হয়, কিন্তু এখানে, অরণ্যের বেলায়, এত কী ব্যতিক্রম ঘটেছে যে, তার সারাজীবনের বেরিয়ে পড়বার ইচ্ছা ও চেষ্টাকে সম্মান দেখিয়ে, অচেনা উৎস থেকে আসা আহ্বানে সাড়া না-দিয়ে বরং বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠি দেখাচ্ছে, নীরবে মুখভার করে আছে মেঘমহল্লার থেকে বৃষ্টিদের আমন্ত্রণ করে এনে, কী এমন ঘনীভূত রহস্য অরণ্যের মাঝে রয়েছে যে, সে এ ভেজা অন্ধকারেও বিস্ময় নিয়ে চেয়ে আছে

রাহা তার খেয়াল থেকে সাড়া লাভ করে, আস্তে-সুস্থে পরিকল্পনাটা বাগিয়ে নেয়, তারপর অরণ্যের সামনে একটা পছন্দমতো অবস্থানে দাঁড়িয়ে স্লো-মোশানে নিজেকে ক্রমশ বিবস্ত্র করে দিতে থাকে, সে দ্রৌপদী নয় যদিও, কারণ তার বস্ত্র অন্য কেউ নয়, হরণ করছে সে নিজেই, কোনোরূপ শব্দসমারোহ নেই, ঠোঁটে-মুখে কোনোই বিকার নেই, চোখ দু’টো গভীর কিছু পর্যবেক্ষণে রত, এ অর্থে যে, সে ইতোমধ্যে যে পরিকল্পনাটা এঁটেছে এবং পরিকল্পনামাফিক যে কর্মটা সে সারছে, তাতে প্রত্যাশিত ফলাফলটা আয়ত্তে আসছে কি না, অথবা এই ঘটনায় অরণ্য কীভাবে সাড়া দিচ্ছে

অরণ্য স্থির নিশ্চিত যে তার সামনেটা অন্ধকার, অঙ্কের হিসেব, কাজেই নড়চড় হবার কথা নয়, কাব্যের কল্পনাবিলাসিতা গণিত কোনোদিন টলারেট করে না, গণিতবিদেরা নিজেরা ভেতরে-ভেতরে কল্পনাবিলাসী ছিলেন এরকম হতে পারে, কিন্তু সূত্র আবিষ্কারে ভেতরকার সে কল্পনাবিলাসিতাকে প্রত্যক্ষভাবে কাজে লাগিয়েছেন এরকম ভাবা যায় না, যেহেতু দুয়ে দুয়ে চার না-লিখে পাঁচ লিখলেও কাব্যের সম্ভ্রমহানী ঘটে না কিন্তু গণিতের ঘটে, তো সামনে যদি নিশ্চিত অন্ধকার, তবে কী এমন দায় তার যে তাকে বেরোতেই হবে, যেখানে বাস তার সেখানটাও আলোময় নয়, কোনোদিন ছিল না এ ডালপাতাদের ভিড়ে, কিন্তু এখানে আর যাই হোক রাহা আছে, তার অন্ধকারের অবলম্বন, তাকে ছেড়ে এই ঘুটঘুটে পথে নেমে কী এমন রত্ন মিলবে, যা তার এরকম বোকামির ঘাটতিটাকে পুষিয়ে দেবে, তার ওপর ব্যাপারটা যেখানে নিশ্চিত যে সামনে অন্ধকার, নিশ্চিতি-অনিশ্চিতি ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণে তার ত্রুটি থাকতে পারে না, কেননা গণিতটা সে কমবেশি বোঝে, যতটা বুঝলে তেলটা-নুনটার হিসেবে কোনোদিন আটকাতে হয় না, ততটা গাণিতিক জ্ঞানই এ হিসেবের জন্যে যথেষ্ট, অতএব সে যাবে না, অচেনারা যে পাড়ায় থাকে, সেখানের তালগাছগুলো কেমন লম্বা, স্নানঘাটগুলো কেমন পরিচ্ছন্ন, এসব জানার জন্যে তাকে আরো কিছুকাল অপেক্ষা করতে হবে, অন্তত কদিন স্থির থেকে দেখে নিতে হবে, নিশ্চিত যে অন্ধকারটা ফণা তুলে আছে, তার ধৈর্যচ্যুতি ঘটল কি না

রাহা এখন সম্পূর্ণ দিগম্বর তার শূন্যতম জন্মদিনের মতো, দু'পা ফাঁক করে সে নিঃশব্দে বসে গেল অরণ্যসকাশে, অরণ্য দেখল তার স্তন-যোনি-নিতম্ব সব কুৎসিত, ঘোর অন্ধকার, কালো, ভয়াবহ-- এগুলো এত চেনা ও ব্যবহৃত যে তার ঘেন্না ধরল, বিবশ চোখ দু'টো মুদে গেল এবং সহসাই জ্বলে উঠল আলো, চোখ বন্ধ করলে সামনে অনেকদূর পর্যন্ত দেখা যায় সমুদ্র ও পাহাড়ের ঢাল, অরণ্যও দেখল, অচেনারা সবাই পথ আলো করে দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে, কেউ সেখানে নিবস্ত্রা নয়, রহস্য ঘনীভূত সেসবের শ্রী-অবয়বে, লোভাতুরা হাতছানি যেন, অরণ্য ভেবে ওঠে সুপারসনিক বেগে, এ রহস্যসমুদয় জানতে হবে, রাহাকে হয়েছে জানা, এবার অন্যে যাব ভবিষ্য আলোয়, সামনেই সিদ্ধি, বিড়বিড় করে উঠে দাঁড়ায় সে, চোখ মেলে এবং বাক্সপেটরা সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে অচেনার পথরেখা ধরে

রাহার এ সাফল্য তাকে তার যোগ্যতা সম্পর্কে আরেকটি নিশ্চিতি দেয়, নিজের প্রতি তার আস্থা বাড়ে, তার দরকার ছিল অরণ্যকে ঘরের বাইরে নেয়া, কেননা সে ভালোবাসে তাকে, এবং সে জানত যে কেবল এভাবেই তাকে রাজি করানো সম্ভব, এ সাফল্যে সে খুব খুশি হয়, সে নিশ্চিত যে, অরণ্য একদিন অচেনাকেও চিনে নেবে, ও তখন তাদেরও অপছন্দ করবে এবং ফিরে আসবে পুরানোয়, তার বুক জুড়ে, যেখানে ততদিনে অগেয় গীতসমেত অজস্র না-চেনা রহস্যপাখি জড়ো হবে দূরে থাকার সুবাদে, তার নিজস্ব অলিগলি ভরে উঠবে চাপ-চাপ সুস্বাদে, না-চেনা রহস্যপাখিদের এই অগেয় গীতসুধা পানতৃষ্ণায়ই অরণ্য সেদিন আবার তার হবে, রাহা জানে

No comments: