Categorisation Narrows the Glory of Creation. A composition of prose miscellany. প্রকাশক : প্রতীতি। প্রকাশকাল ফেব্রুয়ারি ২০০৩।

Thursday, January 31, 2008

পাতাদের ঝরে যাওয়া মানুষের অনিবার্য মৃত্যুরই প্রতীকী ব্যঞ্জনা

লোকটার গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন থাকার কথা ছিল ইস্রাফিলের শিঙাটা বেজে-না-ওঠা পর্যন্ত, কিন্তু ব্যত্যয় ঘটাল পাখিটা, অনেক পাখি আছে পৃথিবীতে, স্বর্গেও থেকে থাকবে হয়ত, যাদের বেশ ভালো লাগে, কী রূপে কী গুণে, অথচ নাম জানা যায় না, এরকম একটা পাখিরই কাণ্ড ছিল এটি, আগে কখনো এ পাখিটার গান শুনেছিল কি না মনে করতে পারে না সে, তবে সে চোখ কচলাতে কচলাতে এমত ধারণা করে যে, পৃথিবীর মানুষ ততদিন অন্তত আনন্দকে বুঝবে, যতদিন এই জাদুর পাখিটা গাবে

তার যখন বাঁশের চাঙাড়ি ও নতুন করে গজিয়ে ওঠা মাসকালাই গাছে মোড়া মাটির আস্তরণ ভেদ করে উঠে আসতে হলো, সহসাই, প্রাক-বিবেচনা ব্যতিরেকে, তখন দুপুর, নদীর অন্তরে তখন নীল আকাশের ছায়া, আকাশের অন্তরে নদীর, আর তখন শনশন বাতাস বইছিল, আকাশের নীলশাড়ি তোলপাড় করে দিচ্ছিল রূপসী নদীর স্রোত, গ্রীষ্মের এরকম রোদেলা দুপুরে কবরের ভেতর ভ্যাপসা গরম থাকতেই পারে, কিন্তু সে কখনো এজন্যে নিজেকে নদীর দিকে বয়ে নিয়ে যাবার কথা ভাবে নি, কেননা পাখিটা ঘুম ভাঙিয়ে দিয়েছে এর মানে এ নয় যে তাকে হাঁটতেই হবে, মোটকথা নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের কথা ভেবে সে কখনোই কোনো কিছু করতে উদ্যত হয় নি, কাজেই আপনি বা আপনারা দয়া করে এমত ভাববেন না যে, লোকটা নিজস্ব কোনো স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্যে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে অন্যত্র গমন করছিল, এবং এটা যে, পাখিরা সবসময় এ ধরনের কার্যক্রমে আনুকূল্য দিয়ে থাকে, সে যাচ্ছিল অথবা যাচ্ছিল না, যাচ্ছিল, কেননা সে প্রতিমুহূর্তে স্থানচ্যুত হচ্ছিল, যাচ্ছিল না, কেননা তার সামনে কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য ছিল না, এবং তার ভাবনারা একাসন তথা নড়চড়হীন ছিল, পায়ের নিচে মচমচ করে গুঁড়িয়ে যাচ্ছিল শুকনো ঝরাপাতা, আর তার উপলব্ধিতে এসে ধাক্কা দিচ্ছিল এক ধরনের নাকী কান্নার সুর, যা অস্পষ্ট, এটি তাকে অন্যরকম করে ভাবাল, সে নিশ্চিত হলো যে, মৃত ও ইতোমধ্যে শুকনো এসব পাতা, যেগুলো দলিত হচ্ছে চারজোড়া পদ-সঞ্চালনে, সেসবের অন্তর্গত বেদনারা তার কর্ণকুহরে অসম্ভবরকম আকুতিময় অনুযোগ তুলছে

মৃতের কোনোরূপ বাদ-প্রতিবাদের শক্তি যে নেই, একথা তার চেয়ে বেশি আর কেউ বোঝে না বস্তুত, কেননা সে নিজে মৃত্যুর অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে, কেননা তার সকল প্রকার বাদ-বিসংবাদের ক্ষমতা ইতোমধ্যে রহিত হয়েছে, এরপরও তার এরকম ভাবনা রহস্যপূর্ণ তো বটেই, অবশ্য পৃথিবীতে ভাববার মতো এত বিষয় থাকতেও, এ মুহূর্তে ঝরাপাতা বিষয়ে ভাবাটা তার জন্যে প্রাসঙ্গিকও বটে, জঙ্গলে বাসজনিত কারণে বন্যপাখি, প্রাণী ও বৃক্ষাদি, সপ্তাহচারেক থেকে তাকে মাত্রাতিরিক্ত আচ্ছন্ন করে আছে, বন্যপ্রাণী বিষয়ে তার ভাবনা এ-যাবৎ বিমিশ্র, এরা চালাক ও একই সঙ্গে বোকা, যেমন এই শেয়াল দু'টো, যারা ধূর্ত খেতাবধারী অথচ চরম বোকামির পরিচয় দিচ্ছে এখন, তার মাংসহীন কঙ্কালটাকে আগ্রহভরে বহন করে, তবে পাখিদের ব্যাপারে তার ভাবনা সবসময় ইতিবাচক, এরা গান গায় আর ঘুম ভাঙায়, ঘুম ভাঙায় আর গান গায়

আপাতত পায়ের নিচে শুকনো পাতার মচমচ নেই, সে এবং তারা এখন নদী তীরবর্তী মোটামুটি বৃক্ষহীন একটা চালায়, কিন্তু কান্নার তীব্রতা তাকে আগের মতোই হানছে, বুঝল সে, এবং এ-ও বুঝল যে, এবার তার কিছু বলা দরকার পাতাদের উদ্দেশে, এই যে-- ‘অত চ্যাঁচিও না, আমাকে এবং তোমাদেরকে যিনি সৃষ্টি করেছেন, তার নির্দেশেই তোমরা ঝরেছ, যেমন একদিন আমি ঝরেছি, যেদিন স্বর্গবৃক্ষ বর্জন করেছে আমার বৃত্তান্ত লেখা পত্রটি’, কিন্তু বলতে কি আসলে পারে সে, তার ঠোঁট নেই, জিহ্বা নেই, কণ্ঠ নেই, পচে-গলে গেছে

সামনেই জলপাই গাছ, বিস্ময় মানতে হয় বৈকি, এরকম স্থানে সে জলপাই গাছ জন্মাতে দেখে নি আগে, পৃথিবীতে, ঠিক নদীর ধারে, আগে দেখতে পেলে এ গাছের নিচে এসে বসা যেত, একা অথবা সস্ত্রীক, এর সমস্ত পাতাই সুন্দর যেগুলো সবুজ, আর যেগুলো মুমূর্ষু ও কমলা-লাল, আরো সুন্দর, আহা পৃথিবী, সে কি কোনো অংশে কম সুন্দর দেখবার চোখ থাকলে, এখানে যেমন নরকের ছায়াপাত ঘটে, তেমনি স্বর্গের, অবশ্য এ মুহূর্তে সে পৃথিবীতে স্বর্গের উপমা খুঁজতেই অধিক স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছে, যার একটিতে ঢুকবে বলে সে সপ্তাহচারেক ধরে রেওয়াজ সারছে, স্বর্গকে বিস্তারিত জানতে পারে নি সে এখনো, অন্ধের হস্তি দর্শনের মতো জেনেছে, মৃত্যুর দিনকয় পর একজন রহমতের ফেরেশতা তাকে নিয়ে গিয়েছিল স্বর্গের দরজা অবধি বোররাক এর মতো দ্রুততায়, আবার তার সঙ্গেই ফিরে এসেছে সে কবরে, মোটামুটি প্রাথমিক হিসেব-নিকেশ সেরে ফেলবার জন্যে, প্রতিদিনই কবরে তার কাছে বিভিন্ন ফেরেশতারা আসছেন বিচিত্র সব খাতাপত্র নিয়ে, পৃথিবীতে বাসকালীন তার অর্জিত পাপ ও পুণ্যগুলোর একত্র সন্নিবেশ ও যোগ বিয়োগের পালা শেষ হলেই মাটির বিছানা থেকে তার ছুটি হবে, কবরকে তার কাছে হাজতখানার মতো লাগছে, কাজেই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব, প্রক্রিয়াগুলো সম্পন্ন করে এখান থেকে সরে পড়বার পক্ষে সে, আর তাছাড়া সে জেনে গেছে, ছোটখাট যে পাপগুলো করেছে সে পৃথিবীতে, সেগুলো তার স্বর্গগমনকে বাধাগ্রস্ত করবে না, একজন মিশুক ফেরেশতা আগেভাগেই তার কানে কথাটা বলে গেছেন, কেননা সে সৎকর্মে ব্রতাবস্থায় আততায়ীর ছুরিকাঘাতে নিহত হয়েছে, সে জানে, যদিও এটা অনুমাননির্ভর, তবু বলা যায় যে তার সম্মানিত আততায়ী এখনো বেশ সুন্দরভাবে স্বাভাবিক বেঁচেবর্তে আছে, কেননা জগতের ওরা বেশ প্রভাবশালী সদস্য, প্রচুর প্রতিপত্তি আছে, আর সে যতদূর জেনে এসেছে পৃথিবীর রীতিনীতি, তাতে নিঃসন্দিগ্ধ হওয়া যায় যে, তার মৃত্যুর সঠিক রহস্যটি কোনোদিনই উন্মোচিত হবে না, কমবেশি যেখানে যা প্রযোজ্য, অর্থ দিয়ে যেকোনো ছিদ্রই বন্ধ করে দেয়া যায় পৃথিবীতে, কেবল এখানে, এখন সে যেখানে আছে, বাঁ'হাতের কারবারটা পুরোপুরি অচল, কেননা ফেরেশতাগণ উৎকোচ গ্রহণ করেন না, কাজেই সে এই ভেবে মনে-মনে আনন্দিত হয় যে, ওই লোকটি, যে তাকে অকারণে খুন করেছে, তারও একদিন এখানে আসতে হবে বুকপকেটে আদ্যন্ত গড়ের মাঠটাকে পুরে নিয়ে

জলপাই গাছটির নিচে এসে থামল বাহকদ্বয়, সে দেখল ওপর দিকে চেয়ে এবং ডানে-বাঁয়ে, ভালো লাগল আরেকবার, অন্যরকম, এরপর সে নদীর দিকে তাকিয়ে দেখল যে, সূর্যটা ঢেউয়ের তালে তালে খেলছে, কখনো বিদীর্ণ হয়ে যাচ্ছে, আবার জোড়া লেগে হয়ে যাচ্ছে আগেরটাই, এসময় একসাথে প্রায় তিনটে পাতা ঝরে পড়ল তার ওপর, শেয়াল দু'টো চমকাল, এমনকি সে নিজেও, যখন এইমাত্র ঝরা পাতা তিনটিও বনের ভেতরকার পাতাগুলোর মতো নাকী কান্না জুড়ে দিল, ব্যাপারটা ঘটল তখনই, গাছে যেসব পাতা অপেক্ষায় ছিল ঝরে পড়বার, কমলা-লাল, কোরাসে গেয়ে উঠল গয়বিসংগীত-- ‘সবুজ ফিরায়ে দাও-- সহসা ঝরব না, আনি তো সুসাম্য-- করি তো প্রার্থনা, আমাদের এ প্রয়াণ-- নিসর্গে কাম্য না’-- এবার অবশ্যই তার কিছু বলা প্রয়োজন, অনুভব করল সে, এবং হঠাৎ সূত্রটাও পেয়ে গেল, মনে পড়ল, তার চোখ নেই কিন্তু সে সব দেখতে পাচ্ছে, কান নেই কিন্তু শুনতে পাচ্ছে, মস্তিষ্ক নেই কিন্তু ভাবতে পারছে, অতএব যৌক্তিকভাবে তার বলতে পারাটাও উচিত, এবং তা কোনোভাবে সম্ভব হয়ে উঠতেও পারে

অকস্মাৎ নড়ে উঠল কঙ্কালটা, আর তার ভেতর থেকে গমগম আওয়াজ উঠল আধিদৈবিক-- ‘তোমাদের ঝরে পড়া মানুষের অনিবার্য মৃত্যুরই প্রতীকী ব্যঞ্জনা...’, শেয়াল দু'টো তখন ভয়ে সন্ত্রস্ত হয়ে দৌড়াতে থাকল দুই বিপরীত দিকে

Tuesday, January 29, 2008

উদ্ভিদের উৎকৃষ্ট প্রতিবেশী না-থাকাটা দোষের বটে

যতটা উচ্চাশায় এই ভরা রোদের দুপুরে অ্যাডভেঞ্চারের নেশাকে বগলে নিয়ে এতদূরে এসেছিল তিতির, কোনোরূপ পরিকল্পনা ব্যতিরেকে, হুট করেই, স্বতঃস্ফূর্ত কবিতার শব্দের মতো মোলায়েম পদপ্রক্ষেপণে, ততটা আশাকে সে পুষ্পমাল্য পরাতে পারে নি, অর্থাৎ ভ্রমণটা সম্পূর্ণাঙ্গ হয় নি তার, গোটা বাগানে নতুন করে চিনবার মতো গাছ সে খুব কমই পেয়েছে, অবশ্য লিগুমেনুসি গোত্রের সেলটিস-খয়ের আর অজ্ঞাতকুলশীল আকাশমণি ও বুনোবুবির সাথে এখানেই তার প্রথম পরিচয়, পাম ও অয়েলপামের পার্থক্যটা এখানে না এলে কুয়াশাবৃতই থেকে যেত হয়ত, থাকার কথা থাকলেও অধিকাংশ গাছে কোনো নামফলক নেই, কিন্তু উদয়পদ্মের ঝোঁপে ছিল, আর এতে সে এমন আনন্দিত হয় যে, গোটা পৃথিবীটাই তার স্মৃতিতে চেনা-চেনা লাগে, এ জাতের পোড়ামাটিরঙা চামচসদৃশ বাঁকা মোটাপাতার গাছ তার প্রতিদিনের শহরে অনেক দেখেছে সে, যদিও নাম জানত না আগে, অনেক গাছের নাম-পরিচয় যেমন অন্যদের কাছে জিজ্ঞেস করে জেনেছে, তেমনি এটিও সে জেনে নিতে পারত, কিন্তু মানুষের কাছে কত জিজ্ঞেস করা যায়, আর তাছাড়া জিজ্ঞেস করলেও উত্তর পাবার নিশ্চয়তা সর্বদাই হয় পঞ্চাশ শতাংশেরও নিচে, এটা সে এতদিনকার অভিজ্ঞতায় জেনেছে হাড়েহাড়ে, এটা খুব আত্মমগ্নতার কাল, সে জানে, এবং জিজ্ঞাসা শুনে কাঁচুমাচু শ্রোতার কাহিল অবস্থা দেখবার তার আর রুচি হয় না, এই অবস্থা দেখলে নিজেরই লজ্জা হয়

এসব নেশায় পাবার পর থেকে অভিজ্ঞতার্জনের পাশাপাশি একটা জরিপও সেরেছে তিতির, যার ফলাফল দেখে সে বিস্ময়ে ফালা ফালা, উদ্ভিদ সম্পর্কে ভালো জানেন, এমন মানুষ শয়ে মাত্র দু'জন, গাছপালা সম্পর্কে কিঞ্চিদধিক ভাবনা-চিন্তা করেন, এমন মানুষ শয়ে সাতজন, আর বাকি একানব্বইজন দু'পায়ে মাড়িয়ে যাচ্ছেন যাদের, জীবকুলে তাদেরও যে বাঁচবার অধিকার আছে, তাদেরও যে সুখদুঃখ আছে, ভাবেন না মোটেই, সে নিজে শয়ে দু'জনের কোটায় পদোন্নতি আশা করে, নিজেকে সে বৃক্ষের একজন উৎকৃষ্ট প্রতিবেশী ভাবতে চায়, তার মতে বৃক্ষ এখন অকৃতজ্ঞ প্রতিবেশী পরিবৃত, অথচ পৃথিবীকে আর কিছুদিন বাঁচতে দিতে চাইলে, উদ্ভিদের উৎকৃষ্ট প্রতিবেশী থাকাটা অতীব জরুরি, এহেন গণিতাচ্ছন্নতার এক পর্যায়ে হঠাৎ তিতিরের মনে পড়ে যায় কল্কেফুলের মতো হলুদ বয়সকে, সে বয়সের শাদা জবা চিনতে যাবার দিনের ঘটনাটা তাকে দোলায়িত করে আজো, কিছু-কিছু দিন থাকে কোজাগরী রাতের মতো স্মৃতিতে ডাগর, ওটা ছিল সেরকমই একটা দিন, কী রোদ সেদিন পথে-পথে, আকাশ চুঁইয়ে যেন আগুন ঝরছিল পৃথিবীতে বৃষ্টির ফোঁটার প্রায়, শাদা বাড়ির অনুষঙ্গে কী শাদাই না লাগছিল ফুলগুলি, নীল গেট, আহা নীল অপরাজিতা, আর সেদিন অনুপম ভাষায় কথা বলেছিল চুলের বেণী, পৃথিবী সেদিন তার দিকে অন্যরকমভাবে তাকিয়েছিল, সে অতঃপর ভয়ে-ভয়ে আনন্দে চিৎকার করে, জগতের সর্বাধিক স্বচ্ছন্দ কায়দায় জাপটে ধরেছিল ধরিত্রীকে কামার্ত কলায়

শাদার বন্যা ছিল সেদিন চারপাশে, পৌরপথগুলোও পিচের অধিক শাদা হয়ে উঠেছিল রৌদ্রনৃত্যে, এরকম হয় না সাধারণত, কিন্তু হলো, হঠাৎই রোদকে খুব অপ্রিয় মনে হলো তার, ভিটামিন ডি-এর জন্যে মৃদু রোদই যথেষ্ট, কেবল এর দোহাই দিয়ে, এত বৈরী যার আচরণ, খরখরে, আজ অন্তত মিত্র ভাবতে পারল না, বরং ছায়া দরকার, যদি চরম উত্তেজনাটা কোনো এক জায়গায় ব্যাহত না হতো, তবে রোদ মিঠা কী ঝাল কী টক, এ ভাবনার মনে উদয়ই হতো না, কিন্তু আসলে হয়েছে যখন, তখন সাপখোপের সম্ভাবনা টপকে, অপেক্ষাকৃত ঘন জঙ্গলে সে ঢুকে গেল ছায়াপাড়ায়, হঠাৎ নড়ে উঠল এক দঙ্গল ঝোঁপ, যার নিচে দু'জন মানুষ জাপটাজাপটি শুয়ে, একজনের পুরুষ্ট গোঁফ আরেকজনের স্তন, তিতির কথা বলে, পাখি আমি, ডালে ডালে ফিরি, আমাকে লজ্জার কী গো, তারা তখন শামুকের মতো গুটিয়ে এল পরস্পরের দিকে, হাঁফ ছাড়ল তিতির, তখন সে গোড়ানিমতলে, জামায় লেগে যাওয়া আলবিদার ডালটা ছাড়াচ্ছিল, বুনোফুল, আহা অনুপম, কী একটা জগৎ, এলেবেলে, আর বলা নেই কওয়া নেই হঠাৎই নরোম কাদায় পা, এত নরোম যেন কিশোরীর স্তন, পা কেবল দাবতেই থাকল, দাবতেই থাকল

নদীর সাথে গাঙচিলের ভাবপর্বের সমন্বয়ক ছিপবাঁশের ছোট্ট সোনামণির মতো সুন্দর গোড়াটিতেই বসা ছিল ছেলেগুলো, তাস হাতে জনাচার, আর তাদের দর্শক হয়ে জনাতিন, কী যে হলো-না-হলো, সহসাই ওই ওঁৎসপ্তক চমকে দিয়ে গাছের সব পাখপাখালি, ঝাঁক ঝাঁক শকুনের মতো টাকি দৌড়ে ছুটল লিগুমেনুসি ঝোঁপটার দিকে, তিতির হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে চা গাছের পাতায় হাত বুলাতে বুলাতে ভাবল শকুনদের কথা, আচ্ছা, শকুনদের মরার অত নির্ভুল সংবাদ কে বা কারা পৌঁছে দেয়, মাছি না অন্য কেউ...

চা-পাতারা এর কোনোই জবাব দেবার প্রয়োজন বোধ করল না

চরম ব্যস্ততার ভেতর আরেকটা কাজ বেড়ে যাওয়া ভারি বিব্রতকর

ওরা দু'জন এখন যে স্থানটিতে উপবিষ্ট, সে স্থানটিতে এর, সাতবছরের পুরানো বিব্রতিমিশ্রিত আনন্দের স্মৃতি আছে, স্থানটির সামনে যথাক্রমে বাইশহাত খাড়া ঢাল, দুশ’ গজ গুঁড়ো ঢেউযুক্ত নদী, আড়াইশ’ গজ শাদা কাশচর, সত্তর গজ শীর্ণ নদী, তিনটে সবুজ বাড়ি ও অসীম দিগন্ত-- পেছনে যথাক্রমে সাতহাত খাড়ি, বিশহাত ঘাসপার্ক, ফুটের হিসেবে ৫৪ ক্ষেত্রফলযুক্ত আটচালা বিশ্রামাগার, ৩৬ ক্ষেত্রফলযুক্ত অকেজো কৃত্রিম প্রস্রবণ, সাড়েচারহাত আরবান পথ, আওড়ি কাঁটা ও সরকারি বাংলো-- ওরা দু'জন বালক-বালিকা, ইন্টারমিডিয়েট বয়স, নাম নেই অথবা জানা নেই-- ধরা যাক একজনের নাম গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি, আরেকজনের অনন্ত বিকেল, ‘এর’ বলতে যাকে বোঝানো হচ্ছে, সে একজন দায়হীন পর্যবেক্ষক, ভবঘুরে ছেলে, নিয়ত সংক্রমণের ভেতর বেড়ে ওঠা ও বসবাসরত, বয়স পঁচিশ, নেশাখোর বলা যায় তবে নেশাতে আসক্তি নেই, কোনো অবস্থাতেই পাগল বলা সঙ্গত নয়, কিন্তু অনেকে বলে, গ্রামের সরলপ্রাণরা বলে মাস্টরসাব, কেউ কেউ কবি বলে, কেউবা সাংবাদিক

ধরা যাক ভবঘুরের নাম নীরব গোধূলি, তো গোধূলি যখন এল শেষপ্রায় বিড়ি টানতে টানতে, তখন বৃষ্টি ও বিকেল জড়াজড়ি করে আছে, ওদের মাঝে কোনোই দূরত্ব নেই, গাছের গুঁড়িতে বসা, গোধূলি ভাবল, বিকেল কেন থাকছে এখনো, তার অবশ্যই চলে যাওয়া উচিত, শেষ রোদ যখন কাশবনে জাদু দেখিয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে, পাখিরা যখন চর ছেড়ে ফিরে আসছে তীরগাছায়, তখন তো বিকেলের থেকে যাওয়াটা কোনোভাবেই টলারেট করা যায় না, প্রকৃতির নিয়মানুযায়ী বৃষ্টি এখন পুরোটা গোধূলির, যদি রোদ সূর্যের হয়, রঙধনু আকাশের

ঘাসেরা একদিন বলাবলি করছিল খুব, দূর থেকে শোনা, যে, বৃষ্টি ও বিকেলে রক্তৈক্য আছে, সম-আধান, দু'জনে অতএব বিকর্ষণই সম্মত চুম্বকের ধর্মানুসারে-- বিকেল মামা, বৃষ্টি ভাগ্নি, কিন্তু আজ যা দেখছে গোধূলি, তাতে তার আরেকবার অন্তত ল্যাবরেটরি রুমে না ঢুকে উপায় নেই, গিয়ে দেখতে হবে যে আসলে ওদের সম্পর্কটা কীসের ভিত্তিতে রচিত, আকর্ষণের না বিকর্ষণের, আরেকটা কাজ বেড়ে গেল, একথা ভাবতে-ভাবতে দক্ষিণমুখো আটগজ হাঁটল গোধূলি, বৃষ্টি বাঁচিয়ে দাঁড়াল এসে অষ্টভুজাকৃতির বিশ্রামাগারে, ইচ্ছে করছিল না খেতে, তবু ওখানে থাকা ফেরিবাজ ছেলেটার থেকে দু'টাকার মটরদানা কিনে হাতে নিতে-নিতে আলগোছে তাকাল পেছনে, দেখল, নিরাপদ বটে ওদের থেকে স্থানটা, এখান থেকে কেবল বৃষ্টি ও বিকেলের কেশাগ্রভাগ দেখা যায়, ওরা লজ্জায় পড়বে না, গোধূলির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যটাই এমন যে সে নিজে থেকে আপন অস্তিত্বটা বিজ্ঞাপিত করতে চায় না, অতএব লুকিয়ে-চরিয়ে হাঁটে, নীরব থাকে, যেজন্যে যাপিত জীবনে তাকে অনেক কিছু থেকেই বঞ্চিত থাকতে হয়েছে, মাঝে মাঝে এ বৈশিষ্ট্যটার জন্য তার নিজের প্রতি রাগ হলেও এ খাদ থেকে উদ্ধারের জন্য কখনো কোনো চেষ্টাই সে করে নি, তা হোক, এসব নিয়ে সে দুশ্চিন্তা করে না, এ বিশ্বাসটা তার পুরোমাত্রাই আছে যে, তার যা প্রাপ্তি তা তাকে ফিরিয়ে দিতেই হবে এবং অন্যেরা সেটা তাকে দেবে, কেননা পরধন-লোভ অনৈতিক, যে প্রকৃতি তাবৎ শিল্পের শিক্ষক, তার ভেতরে এমন অজাচারী কার্যকলাপ পাত্তা পেতে পারে না, গোধূলি অতঃপর হাঁটতে লাগল অস্তাচলের দিকে, এই ভেবে যে, যতক্ষণ অন্তত বিকেল না উঠছে গাছের গুঁড়িটা ছেড়ে, ততক্ষণ ওদিকটা অন্তত বেড়িয়ে আসা যায়, যেদিকে রাত্রিরা ঘরদোর করে থাকে-- ইত্যবসরে দু'টো ঘটনা ঘটল, আকস্মিক এবং কাকতালীয়, মুহূর্তে গোধূলি ভেবে উঠল যে এগুলো তার সাপোর্ট, প্রকৃতিতে কোনো অনিয়ম চলতে থাকলে জীবকুলে দুর্ঘটনা ঘটাই স্বাভাবিক, মুহুর্মুহু, একের পর এক

অষ্টম শ্রেণি ঘেঁষা কিশোর, স্কুলের ইউনিফর্ম পরা, সাইকেলে দীর্ঘ ঢালু খাড়ি পাড়ি দিতে গিয়ে, উলটে কৃতিত্ব দেখাল, এই অর্থে যে, সে ভবিষ্যতে ভালো জিমন্যাস্ট হবে, আরেকটি ঘটনা ঘটল বছর নয়ের অপুষ্টিগ্রস্ত বালকের ক্ষেত্রে, হাফপ্যান্টের সাথে ইন করে শার্ট পরেছে যে, এবং যার খালি পা কুষ্ঠের শাদা দাগে ভর্তি, তেলতেলে, আনমনে নদী দেখছিল সে, হঠাৎ কী জানি কী দেখে এত উল্লসিত হয়ে উঠল যে, হাস্যার্থে চিৎকার করে দু'হাত ইংরেজি ভি বর্ণাকৃতিতে ঊর্ধ্বোত্তোলিত করে ঘুরতে থাকল, এবং এভাবে বড়োজোর তিনটা পাক খেতেই, ধপাস করে পড়ল গিয়ে শহর থেকে নদীতে নেমে আসা বর্জ্যজলবাহী নালার মধ্যে, এ বিয়োগান্তক দৃশ্য দেখে জলতলে স্থূল নিতম্ব ভাসিয়ে দেয়া শুশুককুলের মধ্যে কেমন প্রতিক্রিয়া হয়েছিল কিংবা আকাশপাড়ার চেনামুখ অতীব স্মার্ট ভুবনচিলরা শব্দ করে হেসেছিল কি না, তা কখনো জানা যায় নি

মটরদানাগুলো কী এক অদৃশ্য কারণে তিতকুটে লাগছিল তার, ঠিক সেদিনের মতো, গোধূলি ভাবে, ছেলেটাকে পেলে বলতে হবে যে মটরদানাগুলো সে যেন ফিরিয়ে নেয়, টাকাটা অবশ্য ফিরিয়ে চাবে না সে, এমন একটা প্রতিবাদ সে শিখেছে, যাতে হাতমুখ খারাপ না করেও ‘যারে-দেখতে-নারি’র চলনকে বাঁকা ঠাওরানো যায়, তা প্রায় তখন থেকে, প্রেম করতে শিখেছে যখন লালিমার সাথে-- পেছনে ফিরে সে দেখতে চায়, এ তল্লাটে ছেলেটা আছে কি না, কিন্তু চোখ দু’টো তার এ কাজে মনোযোগী হতে পারে না, দৃষ্টি ফেরায় নিয়ে গামারিতলায়, দেখে, ওরা দু'জন, বৃষ্টি ও বিকেল, এখন বেজায় বিব্রতকর অবস্থার ভেতরে নিপতিত, ব্যাপারটা এই এতদূর থেকেও বেশ বোঝা যাচ্ছে, বখাটেদের উৎপাত সাতবছর আগে যেমন ছিল, এখনো তেমনই আছে দেখা যাচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও হয়ত থেকে যাবে, যদিও সে চায় সব মানুষই একদিন অন্তত এ পর্যায়ে এসে দাঁড়াবে যে, অন্যের অধিকারের ব্যাপারটাকে তারা গুরুত্ব দেবে, বখাটেগুলো সেদিনের মতোই পেছন থেকে ওদের লক্ষ্ করে এটা-ওটা বলাবলি করছে, চিৎকার চ্যাঁচামেচি করছে, শিস দিচ্ছে, ঘটনার আকস্মিকতায় বিকেলের হাতে তার পরিচয়পত্র ঝলসে ওঠে, বাহ সে কি এখন উঠবে, অন্তত তার ওঠা উচিত, বৃষ্টিকে জাপটে ধরে এরপরও বসে থাকা ঠিক নয়, নইলে হীতে বিপরীত কিছু একটাও ঘটে যেতে পারে

নদীর ওপার থেকে যখন সর্বশেষ পাখির ঝাঁকটি উড়াল দেয়, ঠিক তখন ওঠে বিকেল, মেদবহুল মানুষের মতো ধীরেসুস্থে, এবং কী আশ্চর্য, হাত ধরাধরি করে বৃষ্টিও, গোধূলির মনে হয়, পৃথিবীতে তার জন্যে কোনো টেকসই ঠাঁইবাহুল্য নেই, লালিমা তাকে ছেড়ে গেছে সেই কবে, বৃষ্টি সে-ও গেল, ভাবতে-ভাবতে সে তাকিয়ে দেখে, ততক্ষণে রাত্রির ঘরের দরজা-জানালা খুলে যাচ্ছে পটাপট, এবং পৃথিবীময় জ্বলে উঠছে অজস্রাজস্র সান্ধ্য-আলোক